চীনের সেনারা কি সত্যিই ভারতের ৬০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল?
১২ দিন আগে শনিবার, জুন ২০, ২০২৬
অরুণাচলে ভারত-চীন সীমান্ত, যা ম্যাকমোহন লাইন নামে পরিচিত
চীনের সেনাবাহিনী পিএলএ-র সদস্যরা অরুণাচল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে ৬০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে— দিনকয়েক আগে প্রকাশিত এমন একটি খবর ঘিরে দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। সরকারিভাবে প্রায় দু’দিন ভারত এই খবরটি নিয়ে নীরব ছিল। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে জল্পনা আরও বেড়ে যায়।
পরে অবশ্য সরকারের একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, তবে তাতেও তর্ক-বিতর্ক মোটেও কমেনি।
কিন্তু বাস্তবেও কি তা-ই ঘটেছে? চীনা সৈন্যরা ভারতের ভেতরে ঢুকে থাকলে কতদূর এসেছে বা কী ধরনের কাজকর্ম করেছে? বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে গোটা বিষয়টি নিয়ে বিশদে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। তারই ফলাফল এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।
প্রথম খবরটি কীভাবে জানা গেলো?
এই খবরটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘নিউজফাই’ (নিউজ ফর ইউ) নামে অরুণাচল প্রদেশের একটি পোর্টালে। ওই পোর্টালের সাংবাদিক ইরানি সোনোওয়াল লেপচা গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তার এক রিপোর্টে দাবি করেন, রাজ্যের আনজাও জেলার সীমান্তবর্তী কাপাপু এলাকাতে চীনা সৈন্যরা নাকি ভারতের ৬০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং তারা সেখানে ‘ক্যাম্প’ করেও অবস্থান করছিল।
এই দাবির স্বপক্ষে তিনি কিছু ছবিও তুলে ধরেন। যেগুলোতে দেখা যায়— পার্বত্য ওই এলাকায় পাথরের ওপর স্প্রে পেইন্টিং করে চীনা ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে এবং সঙ্গে ‘চায়না’ শব্দটা ও চলতি সালটাও (২০২৪) ইংরেজিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য একটি ছবিতে দেখা যায়— সেখানে আগুন জ্বালিয়ে বনভোজন করা হয়েছে এবং বিভিন্ন চীনা খাবারের উচ্ছিষ্ট আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
সীমান্তের ওই জনবিরল এলাকার কিছু বাসিন্দা ওই পাথরের আর পিকনিকের পরের ছবি তুলে নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করেছিলেন। সেখানে থেকেই নিউজফাই ওই ছবিগুলো পিক করে এবং নিজেদের সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানায় যে, ওই রিপোর্ট প্রকাশের সপ্তাহখানেক আগে (অর্থাৎ আগস্টের একেবারে শেষ দিকে) এই ‘আগ্রাসনে’র ঘটনা ঘটেছিল।
তারা আরও দাবি করে, ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশ (আইটিবিপি) নামে যে বাহিনী ভারত-চীন সীমান্ত পাহারা দিয়ে থাকে, হাডিগ্রা গিরিপথের কাছে তাদের শেষ ক্যাম্পটি অবস্থিত কাপাপুতেই— যে এলাকায় চীনা সৈন্যরা ঢুকে পড়েছিল বলে বলা হচ্ছে। আর চাগলাগাম হলো আনজাও জেলার নিকটতম প্রশাসনিক সার্কেল, যা ভারত-চীন সীমান্ত (ম্যাকমোহন লাইন) থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে।
কেন এই রিপোর্ট নিয়ে বিতর্ক?
গত কয়েক বছরে ভারত-চীন সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় চীনা সৈন্যরা জোর করে ঢুকে পড়েছে, নানা ধরনের স্থাপনা তৈরি করছে বা সেনা-ঘাঁটি পর্যন্ত তৈরি করেছে – এ জাতীয় নানা খবর দেশ-বিদেশের মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতেও এর প্রমাণ মিলেছে। আর চীনারা কোথাও একবার ঢুকলে সেটা যদি ছেড়েও যায়, তার আগে নিজের দেশের নাম বা বাহিনীর প্রতীক সেখানে রেখে দিয়ে যায়। কারণ, এটা তাদের প্রোপাগান্ডার অংশ। কাপাপুর এই ঘটনাতেও সেরকমটাই হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এর আগে এরকম কোনও ঘটনাতেই চীনা সৈন্যরা ভারতের ৬০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে বলে দাবি করা হয়নি— এটা বড়জোর কয়েকশ মিটার বা এক-দুই কিলোমিটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কাজেই নিউজফাই-এর ওই রিপোর্ট নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হতে দেরি হয়নি সঙ্গত কারণেই।
অরুণাচলের প্রথম সারির ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য অরুণাচল টাইমস’ গত ৮ সেপ্টেম্বর (অর্থাৎ মূল রিপোর্ট প্রকাশের দু’দিন পরে) জানায়, তারা ওই খবরের সত্যাসত্য জানতে আসামের তেজপুরে সেনাবাহিনীর পিআরও বা জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু তার কাছ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। সেনাবাহিনী প্রথমে এই বিষয়টি নিয়ে নীরব থাকায় যথারীতি এটি নিয়ে জল্পনা বাড়তে থাকে।